বাংলা ও বাঙালীর স্বজন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২০

মৃনাল চৌধুরী লিটন

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকাঠামোতে প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার সূত্রপাত করে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন, Mr. President, Sir, I move: “That in sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘English’ in line 2, the words ‘or Bengalee’ be inserted.” আবেগতাড়িত কণ্ঠে ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলার সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে যা বলেন সেটিই পরবর্তীকালে বাংলা ভাষাভাষীর প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়। তিনি বলেছিলেন, যেহেতু পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষই বাঙালি, সেহেতু সঙ্গত প্রশ্ন, Sir, what should be the State Language of the State? The State Language of the Sate should be the Language which is used by the majority of the people of the State.’ ভাষা-সম্পর্কিত একটি নির্দোষ সংশোধন আলোচনা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষার দাবীতে রূপ লাভ করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, “So, Sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our State and therefore Bengalee should not be treated as a Provincial Language. It should be treated as the language of the State. সেই দাবী তুঙ্গে ওঠে ঠিক চার বছর পর ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বক্তব্যের জনাবে লিয়াকত আলী খানের বক্তব্য ছিলো সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ। তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান যেহেতু একটি মুসলিম রাষ্ট্র, সেজন্যে ভাষার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় চরিত্র রক্ষা করার জন্যে উর্দুর প্রাধান্য থাকা প্রয়োজন। যেহেতু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই অংশেই মুসলমানদের সংখ্যা বেশি, সেজন্যে রাষ্টভাষার ক্ষেত্রে উর্দুর প্রাধান্য আবশ্যিক। যদিও তিনি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে প্রদেশের সব মানুষের কথ্য, লিখিত ও ব্যবহৃত ভাষা বাংলা ব্যবহার প্রসঙ্গে আপত্তি তোলেন নি; কিন্তু মূল আলোচনা অর্থাৎ বাংলার রাষ্ট্রীয় অধিকার শুধু অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ভারতীয় চর, কমিউনিস্ট, বিচ্ছিন্নতাবাদী ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, কোনো বাঙালি মুসলিম লীগ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সমর্থন জানান নি, বাংলার পক্ষে বক্তব্যও রাখেন নি। এমনকি সংসদের স্পিকার বাঙালি তমিজউদ্দিন খানও ধীরেন্দ্রনাথের সংশোধনী প্রস্তাবের বিষয়ে শেষে রায় দিয়েছেন-‘Sir, I cannot accept this amendment.’ ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ভাষা-বিতর্কে শেষ বাক্যটি ছিলো- ‘The Motion was negative.’কিন্তু সেই negative-ই কতোখানি positive হয়ে উঠতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া গেলো কয়েকদিন পরেই। করাচীতে গণপরিষদের অধিবেশন শেষে পূর্ব বাংলার সদস্যরা ঢাকা ফিরলেন। তেজগাঁ বিমানবন্দর। তেমন কোনো নিরাপত্তা বা প্রহরা নেই। পূর্ববঙ্গের সংসদ সদস্যরা বিমান থেকে নেমে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ধীরেন্দ্রনাথ লক্ষ্য করলেন মূল গেটের কাছে কিছু যুবক চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মনে করেছিলেন, গণপরিষদে বাংলার সপক্ষে কথা বলায় তারা হয়তো বিক্ষোভ জানাতে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে দেখা গেলো প্রত্যেকে চাদরের তলা থেকে রাশি রাশি ফুল বের করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর বর্ষণ করতে লাগলো। তারা সবাই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।” আইনজীবী সমাজকর্মী, রাজনীতিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলা থেকে তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ধীরেন দত্ত তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন এবং বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম বা সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হন। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে করাচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে যোগদান করেন এবং তৎকালীন পূর্ব বাংলায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের পক্ষে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৭ সালে গঠিত সংবিধান সভা একই সঙ্গে পাকিস্তান গণপরিষদ হিসেবেও কাজ করে। ওই গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই পূর্ব বাংলায় বাংলাকে অফিস-আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছআদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনেরই প্রতিফলন ঘটে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত ভাষা বিষয়ক সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি উত্থাপন করেন। তিনি যুক্তি দেন পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাই বেশি এবং তারা বাঙালি, সেহেতু বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সকল কার্যাবলীর জন্য ব্যবহার করা উচিত এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। কিন্তু লিয়াকত আলী খান সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের ভিত্তিতে এই দাবী নাকচ করে দেন।