ঢাকা, ১৮ই জুন, ২০২১ ইং

একজন র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার

বিজয়নগর

নিউজ

প্রকাশিত: ৯:১৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামীলীগ রাজনীতি এখন বিষপুড়া,সর্বত্রই আওয়ামীলীগের দুই নেতার আলোচনা ও সমালোচনা। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের যেমন আওয়ামীলী রাজনীতিতে রয়েছে ত্যাগ তেমনী রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার রাজনীতি ও উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী নিয়ে ঢাকাটাইমে লিখেছেন মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু পাঠকদের জন্য সম্পূর্ণ লিখাটি নিচে দেওয়া হলো– অনেকদিন থেকেই শুনে আসছি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক দুজন দুই মেরুকরণে অবস্থান করাতে জেলার আওয়ামী রাজনীতিতে এক উত্তেজনামূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য আসলে দায়ী কে তা বের করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী না থাকাতে এখন বলতে গেলে প্রায়ই জেলায় চলছে আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগে লড়াই। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও কিছুদিন আগে কুমিল্লার মেয়র নির্বাচন তারই প্রমাণ রাখছে। এভাবে চলতে থাকলে এবং আগামী নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগের পক্ষে বেশ কিছু আসন হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে জাতির জনকের কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সময় থাকতে একটি সঠিক সিদ্ধান্তে এগিয়ে আসা উচিত বলে দলের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষিরা মনে করেন। ৭২ থেকে ৭৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে দেশের বর্তমান অনেক কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদদের সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এদেরই একজন হলেন র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। অবশ্য এই নামের চেয়ে তিনি আমার কাছে রবিউল আলম চৌধুরী নামে বেশি পরিচিত। তিনি মুক্তিযুদ্ধে পায়ে আঘাত পান। সে হিসেবে তাকে আমরা এখন যুদ্ধাহত একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানের চোখে দেখতে পারি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের প্রথম জাতীয় কাউন্সিলে শেখ শহিদুল ইসলাম ও এম এ রশিদ পরিষদে গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। ঐতিহাসিক এই কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই সময় আমি ঢাকা আইডিয়াল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। সেই সূত্রে প্রায়ই সন্ধ্যায় ঢাকা টিচার্স কলেজ ইনস্টিটিউটের অপরপাশে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যালয়ে আমার যাতায়াত ছিল। কারণ দোতলায় কেন্দ্রীয় অফিস আর নিচ তলায় ছিল ঢাকা মহানগর ছাত্র লীগের অফিস। একটি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঢাকা মহানগর অফিসে আসলে কখনো কখনো কেন্দ্রীয় অফিসেও যেতে হয়েছে অনেকবার। আজকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছিলেন এই সময় কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক। ছাত্রলীগ অফিসে আসা যাওয়ার কারণে ওবায়দুল কাদের ও রবিউল আলম চৌধুরী সাথে আমার দেখা ও ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি পায়l আজ এতো বছর পর এখনো বাংলাদেশে গেলে তাদের অনেকের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয়। যদিও এখন আমার আর বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক নেই। তবে দেখা হলে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন আর বর্তমান রাজনৈতিক হালচাল নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়ে থাকেl সম্প্রতি আমার বাংলাদেশ সফরকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে টেলিফোনে দুইবার কথা হলেও দেখা করার সুযোগ হয়নি। অন্যদিকে রবিউল আলম চৌধুরীর সাথে আমার সাথে আসা সুইডিশ এমপিদের সাথে বৈঠক হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। তিনি সুইডিশ এমপিদের ঢাকা হজরত শাহ জালাল বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এইসময় সুইডিশ এমপিদের ব্রাম্মণবাড়িয়া গ্যাস ফিল্ড পরিদর্শনে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে সম্ভব হয়ে উঠেনি। আমরা যখন ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি জাতির জনকের ৩২ নম্বার বাসভবনে গিয়ে মাল্যদান করি। তখন তিনিও ছিলেন আমাদের সাথে। ছাত্রজীবন থেকেই রবিউল আলম মোহাম্মদ উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর লেখা হাত ছিল খুবই দুর্দান্ত। ঢাকা শহরের বিভিন্ন কলেজ শাখার নির্বাচনের প্রচারপত্রগুলো তিনি সবসময় লিখে দিতেন। শুধু তাই নয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে ঢাকার বাহিরেও বিভিন্ন জেলায় তার লেখা রাজনৈতিক প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। এভাবেই সময়ের এক পর্যায়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনীতির এই ক্রান্তিকালে যখন ডালিম, রশিদ, ফারুক আর মোশতাক চক্র জিয়াকে সেনাবাহিনীর প্রধান বানিয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা দখল করে রেখেছিলো তখনও গোপনে ঢাকায় ছাত্রলীগের সংগঠনকে ওবায়দুল কাদের, রবিউল আলম চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর (বর্তমানে বিএনপি নেতা), মুকুল বোস এস এম ইউসুফ, ইসমত কাদির গামা, খ ম জাহাঙ্গীর, কামাল মজুমদার, আকবর আলী মর্জি, মানিকগঞ্জের গোলাম মহিউদ্দিন, পারভীন সুলতানাসহ আরো অনেকে গোপনে সুসংগঠিত করেছিলেন। এদের সক্রিয়তার কারণেই পঁচাত্তর সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মৌন মিছিল সফলভাবে হয়েছিল। এইসময় আমরা গোপনে বিভিন্ন স্থানে মিলিত হয়ে খুনিদের বিরুদ্ধে প্রচারপত্র বিলিসহ খন্দকার মোশতাকের ডাকা সংসদ অধিবেশনে এমপিদের যোগদান না করার জন্য হুমকি চিঠি বিলি করেছিলাম। এসকল কাজের নেতৃত্বে রবিউল আলম চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার একসময় ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দিলে ছাত্রলীগের ডাকা প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় মনিরুল হক চৌধুরী (বর্তমানে বিএনপি নেতা) কে খন্দকার মোশতাকের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে এই সভাতে সভাপতিত্ব করতে না দেওয়ার জন্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, খ ম জাহাঙ্গীর, এস এম ইউসুফসহ আরো কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বিশেষ ভূমিকা রেখে ছিলেন যা আজ অনেকেরই জানা থাকার কথা নয়। সেদিনের সেই সভা শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়ে গিয়েছিলো। মনিরুল হক চৌধুরী ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে সাথে নিয়ে সভা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এভাবেই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে ৭৬ এর জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় ছাত্রলীগের গোপনীয় রাজনীতিতে রবিউল আলম চৌধুরীসহ উল্লেখিত নেতারা ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। এ সব পরীক্ষিত নেতাদের মধ্যে একমাত্র মমতাজ হোসেনকে (সাবেক রাষ্ট্রদূত) এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরিতে থাকাকালে তিনি নানাভাবে ছাত্রলীগ যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের সহযোগিতা করেন। ৯৬ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তাদির চৌধুরীকে তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। ২০০১ বিএনপি ক্ষমতায় এলে তার উপর নেমে আসে নানা নির্যাতন। এক পর্যায়ে জোরপূর্বক তাকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়। সুইডেনে অবস্থান করার কারণে উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সাথে আমার যোগাযোগ আগের মতো আর রাখা সম্ভব হয়নি। তবে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার সক্রিয়তার খবর সবসময় জেনেছি। কখনো কখনো টেলিফোনেও কথা হয়েছে। ৭১ মুক্তিযুদ্ধ একসময়ের ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা সত্বেও বহু পরীক্ষিত এই রাজনীতিবিদকে কেন এখনো সঠিক স্থানে দায়িত্ব দেওয়া থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে তার উত্তর একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাই বলতে পারবেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়া সত্ত্বেও মিডিয়াতে আসা সমালোচিত সেই মন্ত্রী কোনো এক বিশেষ কারণে এখনো বহাল রয়েছেন। স্থানীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে কটূ বক্তব্য দিয়েছেন বলে মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন সম্ভবত তাকে তার মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াতে মন্ত্রী সমর্থকেরা সম্ভবত এখন নিজেদের শক্তি আরো বৃদ্ধি করার সুযোগ করে নিয়েছেন। র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী জেলা শাখার সভাপতি হওয়া সত্বেও এ ধরণের একটি অনুষ্ঠানে কেন তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি বিষয়টি আমার মতো অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। উপজেলার অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আসবেন অথচ দলের সভাপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না এ কেমন কথা? মন্ত্রী ও রবিউল আলম মুক্তাদির চৌধুরীর মতানৈক্যকে এভাবে জিইয়ে রাখলে যে কোনো সময় যে কোনো পরিস্থিতির মধ্যে সরকারকে পড়তে হতে পারে যা দলের জন্য আদৌ কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। অন্য কোনো কিছু না দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী একজন পরীক্ষিত নেতা। শেখ হাসিনার পাশে থেকে তিনি একসময় তার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সুতরাং তিনি ভালো করেই জানেন কে এই রবিউল আলম চৌধুরী? লেখক: কাউন্টি কাউন্সিলার, স্টকহোম কাউন্টি কাউন্সিল

সুএ চিনাইর বার্তা

  • এই বিভাগের সর্বশেষ