ঢাকা, ১৬ই জুন, ২০২১ ইং

ভাষা আন্দোলনের প্রথম বীজ বপন করেছেন ভাষা সৈনিক শহীদ ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’ !

বিজয়নগর

নিউজ

প্রকাশিত: ৩:২৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০

মৃনাল চৌধুরী লিটন।। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের মহান মননের প্রতীক হচ্ছে একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেখানে মিশে আছে ১৯৫২ এবং ১৯৭১ এর ইতিহাস আর ঐতিহ্য ! আমাদের জাতি সত্ত্বার শ্রেষ্ঠতম পরিচয় বহন করে একুশের ভাষা আন্দোলন – যেখানে মাতৃভাষা ‘বাংলা’ রক্ষার্থে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি বাংলার দামাল সন্তানেরা ! এই প্রকার ইতিহাস সারা পৃথিবীতে বিরল এক দৃষ্টান্ত ! এই রক্ত ঝরা ভাষা আন্দোলনের যিনি প্রথম বীজ বপন করেছেন তিনি হচ্ছেন ভাষা সৈনিক এবং শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’ ! ভাষা সৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার (তদানীন্তন ত্রিপুরা) ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর বাবার নাম জগৎবন্ধু দত্ত ! তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী, তিনি কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার হিসাবে তাঁর দীর্ঘ চাকুরী জীবনে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন ! ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পড়াশোনা করেছেন নবীনগর হাই স্কুল, কুমিল্লা কলেজ, এবং কলকাতার কলেজে। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করে কুমিল্লা কলেজ এ ভর্তি হন এবং ১৯০৬ সালে সেখান থেকে এফ.এ. ও ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেছেন ! একই কলেজ থেকে ১৯১০ সালে বি.এল পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন ! ১৯০৬ সালে ছাত্রজীবনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বয়স যখন মাত্র ২১ বছর তখন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের আইনজীবী কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর ১৪ বছরের কিশোরী কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯১০ সালে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন, প্রথমে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন তৎপর শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন ! দেশ ভাগের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নে গঠিত হয় ‘পাকিস্তান গণপরিষদ’। ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নে সংবিধানে কোন ভাষা ব্যবহার হবে- গণপরিষদের অধিবেশনে এ প্রশ্ন তোলা হলে প্রথম বাংলাভাষার দাবি উত্থাপন করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ! সেদিনই তিনি তৎকালিন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার দাবী আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখে পাকিস্তান এর করাচীতে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের প্রথম সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মূল প্রস্তাবের ২৯ নং বিধির ১ নং উপ-বিধিতে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি ‘বাংলা’ শব্দটি যুক্ত করার দাবি জানিয়ে সংশোধনী প্রস্তাবটি দাখিল করেন যেখানে মূল প্রস্তাবে উত্থাপিত হয়েছিল – উর্দুর সঙ্গে ইংরেজিও পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে বিবেচিত হবে। পাকিস্তান গণ পরিষদে প্রথম বাংলা ভাষার মর্যদা দাবির প্রস্তাব উত্থাপক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি তিনিই প্রথম পাকিস্তানের আইন পরিষদের অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মযার্দাদানের আহবান জানিয়েছিলেন। সেটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল করাচিতে। সেদিন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেই প্রস্তাবনাতে বলেছিলেন, “out of the six crore and ninety lakh people inhabiting the state, 4 crore and 40 lakhs of people speak Bengali language. So, Sir, what should be the State language of the state? The state language of the state should be the language which is used by the majority of the people of the state, and for that, sir, I consider that Bengali language is a lingua franca of our state .’ পাকিস্তানের শাসক সেদিন ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের এই প্রস্তাবে এবং এর সর্মথনে আইনসভায় তাঁর ভাষনে বিচ্ছিন্নতার গন্ধ আবিস্কার করেন এবং তাকে ভারতীয় দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার সর্বপ্রকারে অপপ্রয়াস চালান। এরপর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে, ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ১৯৭১ সালে সীমান্ত পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর। কিন্তু দেশের মানুষের কথা ভেবে তিনি তা করেননি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণহত্যার সুচনা পর্বে ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী তাঁকে ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা ও অন্যদের তা দেখানোর অপরাধে তাঁর উপর নির্মম নির্যাতন চালান হয়। হানাদার বাহিনী ভারি কিছুর সাহায্যে তাঁর হাঁটু ভেঙে দেয় এবং চোখ উপড়ে ফেলে। অবশেষে

মুক্তি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক ধীরেন্দ্র নাথ দত্তকে তাঁর একছেলে সহ কুমিল্লার নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাকহানাদার বাহিনী তাদের ক্যাম্প এ আটক করে এবং পাকহানাদারদের হাতে শহীদ হন বাংলা ভাষার এই প্রাণপুরুষ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ! বলতে গেলে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার দাবী উত্থাপনের সময় থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সকল কর্মসূচীতে সক্রিয় পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সমাবেশ, মিছিল, গণসংযোগ রূপরেখা প্রণয়ন ইত্যাদিতে সকলের সাথে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শুধু একলা নন তাঁর পারিবারিক পরম্পরায় সকলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষক ও দেশ প্রেমিক – মনে প্রাণে বাঙালিত্ব তাঁদের পরিবারের রক্তে মিশে আছে ! নারী জাগরণ, নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সমাজকর্মী এবং পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি তুলে ধরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি অ্যারোমা দত্ত ২০১৬ বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত হয়েছেন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত কে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করে জাতীয় সংসদ নিয়ে আসেন আসেন এই ভাষার মাসে পরম শ্রদ্ধেয় ভাষা সৈনিক ও আমাদের আত্ম অহংকারী মহান মুক্তি যুদ্ধে শহীদ ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে’ জ্ঞাপন করি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অপরিসীম কৃতজ্ঞতা

  • এই বিভাগের সর্বশেষ