জাতির পিতাকে দ্বিতীয় দফা হত্যার চক্রান্ত ।। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

প্রকাশিত: ৭:২৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০২০

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দেশের মানুষের কাছে একটি সময়োচিত আহ্বান জানিয়েছেন। কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ক্ষতি করা এবং ঢাকায় একাত্তরের শহীদ মধুসূদন দের ভাস্কর্য আংশিক ভাঙার দরুন দেশময় যে ক্রোধ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তা উপশমের জন্য তিনি বলেছেন, ‘সব ব্যাপারে মাথা গরম করবেন না।’ অবশ্যই জাতির পিতার ভাস্কর্যের ক্ষতি সাধন ‘সব ব্যাপারের’ মধ্যে পড়ে না। এটি যেকোনো ভয়ংকর অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ। এই অপরাধ ঘটায় সারা দেশ, সারা জাতি অবশ্যই গর্জে উঠবে। কিন্তু সেই গর্জে ওঠাটা যাতে কোনো হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটায় ওবায়দুল কাদের তারই ডাক দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমরা কোনো সংঘাতে যাব না। আমরা যুক্তিতর্ক দিয়ে দেখাব মূর্তি আর ভাস্কর্য এক নয়।’

আওয়ামী লীগ নেতার এই বক্তব্যটি সময়োচিত। কারণ হেফাজতি এবং তাদের পেছনে জোটবদ্ধ অপশক্তির উদ্দেশ্য, করোনা নিয়ে যখন সরকার বিব্রত, সেই সময়ের সুযোগ নিয়ে দেশে অশান্তি ও উপদ্রব সৃষ্টি করা। তারা এখন পর্যন্ত সেটি পারেনি। সারা দেশে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিন্তু ভাস্কর ভাঙার উসকানিদাতাদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি। এই গায়ে হাত দেওয়া উচিত হবে না। দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতিদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া চলবে না। এর আগে বিএনপি-জামায়াত দেশে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছে। পারেনি। এখন হেফাজতের কাঁধে চেপে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে ইস্যু করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। তাদের এই ফাঁদে পা দেওয়া দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উচিত হবে না।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতীতে অনেক রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে তাঁর ধৈর্য ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেখিয়েছেন। একসময় অনেকেই বলছিলেন, হাসিনা সরকারের পক্ষে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের, বিশেষ করে গোলাম আযম ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়ে হাত তোলা সম্ভব হবে না। দিলে দেশে আগুন জ্বলবে। হাসিনা সরকার ঠিকই তাদের বিচার এবং চরম শাস্তি দিয়েছে। দেশে একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠিও জ্বলে ওঠেনি। এখনো অনেকে হেফাজতের শক্তিকে শাপলা চত্বরের সার্কাসের পরেও একটু বড় করে দেখছেন। প্রচার করছেন, ভাস্কর্য ভাঙার ব্যাপারে হাসিনা সরকার কঠোর হতে পারবে না। আমি তাদের মতো হতাশাবাদী নই। একটু অপেক্ষা করলেই হয়তো দেখা যাবে শেখ হাসিনা সাপ মেরেছেন, লাঠিটা ভাঙতে দেননি।

এই সরকার দেশে কোনো অশান্তি ঘটতে দেবে না। করোনা প্রতিরোধে যখন দেশব্যাপী ভ্যাকসিন দানের অভিযান চালাতে হবে, তখন রাজনৈতিক অশান্তি সৃষ্টি হতে সরকার দিতে পারে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য যারা ভেঙেছে, তারা যেমন বিচার ও শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না, তেমনি তাদের পেছনের উসকানিদাতা অপশক্তির চক্রান্তও সফল হতে দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার ওপর এটুকু আস্থা আমার আছে।

কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার ভাস্কর্যের যারা ক্ষতি করেছে, তারা মাদরাসার ছাত্র। তাদের পেছনে কারা আছে তা বুঝতে একটি বালকেরও কষ্ট হবে না। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, পেছনে কাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উসকানিতে এই অপরাধ করা হয়েছে, তাহলে তাদেরও অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা উচিত। জাতির পিতার ভাস্কর্যের অবমাননা জাতিদ্রোহ, রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এই অপরাধেই তাদের বিচার হওয়া উচিত। এরই মধ্যে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগে দুটি মামলার আবেদন জমা পড়েছে ঢাকার আদালতে।

আমার এই লেখাটি যদি ঢাকার উচ্চপর্যায়ের কোনো পুলিশ অফিসারের চোখে পড়ে, তাহলে তাঁদের অনুরোধ জানাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যাঁরা একাত্তরের শহীদ, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয় মধুদার ভাস্কর্যের যারা ক্ষতি করেছে তাদেরও অবিলম্বে খুঁজে বের করা এবং গ্রেপ্তার করা হোক। আমার ধারণা, এই দুর্বৃত্তরাও হয় মাদরাসার ছাত্র, নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরের ক্যাডার। এখনই এদের শাস্তি না দিলে এরা মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত অন্যান্য ভাস্কর্যের দিকে হাত বাড়াবে।

সবচেয়ে লজ্জার কথা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে জাতির পিতা এবং দল-মতের ঊর্ধ্বের জাতীয় নেতা, সেখানে তাঁর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত জাতির স্বাধীনতার ভিত্তিমূলেই আঘাত করার শামিল। কিন্তু এই ঘৃণ্য অপরাধের নিন্দা করে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় শিষ্য হওয়ার দাবিদার ড. কামাল হোসেন বা তাঁর কমরেডদের কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি দানের কথা জানা যায়নি। তারা মনে হয় ‘গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য কাতর। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নয়। স্বাধীনতাই যদি না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র থাকে কি?

কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার ভাস্কর্যের যারা ক্ষতি করেছে, তারা মাদরাসার ছাত্র। তাদের পেছনে কারা আছে তা বুঝতে একটি বালকেরও কষ্ট হবে না। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, পেছনে কাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উসকানিতে এই অপরাধ করা হয়েছে, তাহলে তাদেরও অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা উচিত। জাতির পিতার ভাস্কর্যের অবমাননা জাতিদ্রোহ, রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এই অপরাধেই তাদের বিচার হওয়া উচিত। এরই মধ্যে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগে দুটি মামলার আবেদন জমা পড়েছে ঢাকার আদালতে।

আমার এই লেখাটি যদি ঢাকার উচ্চপর্যায়ের কোনো পুলিশ অফিসারের চোখে পড়ে, তাহলে তাঁদের অনুরোধ জানাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যাঁরা একাত্তরের শহীদ, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয় মধুদার ভাস্কর্যের যারা ক্ষতি করেছে তাদেরও অবিলম্বে খুঁজে বের করা এবং গ্রেপ্তার করা হোক। আমার ধারণা, এই দুর্বৃত্তরাও হয় মাদরাসার ছাত্র, নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরের ক্যাডার। এখনই এদের শাস্তি না দিলে এরা মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত অন্যান্য ভাস্কর্যের দিকে হাত বাড়াবে।

সবচেয়ে লজ্জার কথা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেখানে জাতির পিতা এবং দল-মতের ঊর্ধ্বের জাতীয় নেতা, সেখানে তাঁর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত জাতির স্বাধীনতার ভিত্তিমূলেই আঘাত করার শামিল। কিন্তু এই ঘৃণ্য অপরাধের নিন্দা করে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় শিষ্য হওয়ার দাবিদার ড. কামাল হোসেন বা তাঁর কমরেডদের কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি দানের কথা জানা যায়নি। তারা মনে হয় ‘গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য কাতর। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নয়। স্বাধীনতাই যদি না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র থাকে কি?

কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে হামলা হওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানকার বিএনপি অফিসে হামলা করেছে। সে জন্য বিএনপির মহাসচিব ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অবশ্যই তিনি এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করবেন। কিন্তু তার আগে জাতির পিতার ভাস্কর্যে দুর্বৃত্তদের হামলার নিন্দা জানানো তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব কি ছিল না? তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির এই দায়িত্বটুকুও পালন করেননি। বরং জাতির পিতার ভাস্কর্য অবমাননার মধ্যে সরকার উচ্ছেদের ডাক শুনতে পেয়েছেন এবং সবাইকে সে জন্য তৈরি হতে বলেছেন।

বুঝতে বাকি থাকে না, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙাটা হচ্ছে আসলে তাঁদের রাজনৈতিক ডাক এবং সেই ডাকে সবাইকে তৈরি হতে বলেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতারা বঙ্গবন্ধুকে একবার ১৯৭৫ সালে হত্যা করেছেন। তাতে তাঁর আদর্শকে উত্খাত করতে না পেরে তাঁদের এই দ্বিতীয় দফা হত্যাচেষ্টা। ১৯৭৫ সালে যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমা করেননি। বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। আমার আশা, ২০২০ সালে মুজিববর্ষে যারা জাতির পিতাকে দ্বিতীয়বার হত্যার চক্রান্তে নেমেছে, শেখ হাসিনা তাদের প্রতি দুর্বলতা দেখাবেন না। বিচার করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

আরও পড়ুন >> রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যাচ্ছে, স্বদেশে যাবে কবে? ।। বিভুরঞ্জন সরকার
বাংলাদেশে বিএনপি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তাই জাতির পিতাকে তারা দ্বিতীয় দফা হত্যার চক্রান্তে মেতেছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এই ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহের দ্বিতীয় নজির নেই। ভারতে কট্টর গান্ধীবিরোধী বিজেপি গান্ধীকে ভারতের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করে। তাঁর জন্মতিথি, মৃত্যুদিবস পালন করে। যমুনাতীরে গান্ধী ঘাটে এবং মহাত্মার ভাস্কর্যে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের রাজনৈতিক দল এখন ক্ষমতায় নেই। আতাতুর্কের সহকর্মী ইসমেত ইনোনু দীর্ঘ ৯ বছর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট থাকার পর ক্ষমতা ছেড়েছেন তা-ও আজ ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তুরস্কে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই কামাল আতাতুর্ককে আতাতুর্ক বা তুরস্কের পিতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তুরস্কের যে ইস্তাম্বুল শহরকে বলা হয় মসজিদ নগরী। কারণ এখানে দুই হাজারের বেশি মসজিদ আছে, সেই ইস্তাম্বুলেও আছে কামাল আতাতুর্কের অভ্রভেদী বিশাল ভাস্কর্য। তাতে ধর্মের কোনো হানি হয়েছে বলে ইস্তাম্বুলের একজন আলেমও বলেননি। তাহলে বাংলাদেশের জামায়াতি এবং হেফাজতিরাই কি দেশের একমাত্র আলেম সম্প্রদায়, না তারা আলেমের ছদ্মবেশে ধর্মব্যবসায়ী?

যে তুরস্কের কথা এখানে বললাম, সেই তুরস্কের বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় ঘোষণা করেছেন, তাঁর সরকার তুরস্কে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিশাল ভাস্কর্য স্থাপন করবে। অন্যদিকে ঢাকার কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে অথবা তার কাছাকাছি মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে। এই ঘোষণাটি দুই সরকারেরই পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। সুনিশ্চিতভাবেই এই ঘোষণা বাবুনগরীদের গালে একটি চপেটাঘাতের মতো।

বাংলাদেশে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার নব উত্থান দেখে ৭০-৮০ বছর আগে লেখা কবি নজরুলের একটি কবিতার কয়েক লাইন মনে পড়েছে—

‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে

আমরা তখনো বসে

বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি

ফেকাহ্-হাদিস চষে।

বাহিরের দিকে মরিয়াছি যত

ভিতরের দিকে তত

গুনতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি

গরু ছাগলের মত।’

৬০-৭০ বছর আগের আমাদের এই জীবনচিত্রটি কিছুমাত্র বদল হয়েছে কি?

সুএ। মত ওপথ