করোনা: সাংবাদিকদের খোঁজ খবর কেউ রাখে না

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২০

তানভীর আমিদ রাজীব : করোনার ঝুঁকিতে সারা বিশ্ব বিপর্যস্ত। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। করোনা মোকাবেলায় এখনো সেরকম ব্যবস্থা নেই। কেবল জনসমাগম থেকে দূরে থাকা আর সতর্ক ও সচেতনতা অবলম্বন ছাড়া। করোনা ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য সরকার থেকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ওই নির্দেশনা মানছেন অনেকেই। কিন্তু সবাই যদি ওই নির্দেশনা মেনে ঘরে থাকে তাহলে কি করোনা মোকাবেলা সম্ভব হবে? হবে না। সবার নিরাপত্তায় কেউকে না কাউকে ঝুঁকি নিতেই হবে। তাই কঠিন স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকার পরও এক শ্রেণির মানুষ মাঠে থেকে করোনা মেকাবেলায় কাজ করছেন।আপনি যখন ঘরে বসে নিরাপদে টিভি,পত্রিকা কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর দেখছেন বা পড়ছেন, সেই খবর সংগ্রহের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খবর সংগ্রহ করছেন সাংবাদিকরা।

এই খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ১৫ জন গণমাধ্যম কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া,গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট আরো তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

এরমধ্যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির একজন ক্যামেরাপার্সন, যমুনা টিভির একজন সংবাদকর্মী, দীপ্ত টিভির চার সংবাদকর্মী, এটিএন নিউজের একজন সংবাদকর্মী, যমুনা টিভির নরসিংদী প্রতিনিধি, একাত্তর টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি, বাংলাদেশের খবরের একজন সংবাদকর্মী, দৈনিক সংগ্রামের এক সংবাদকর্মী, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পত্রিকার সম্পাদক, রেডিও টুডের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, ভোরের কাগজের বামনা উপজেলা (বরগুনা) প্রতিনিধি এবং আরটিভি অনলাইনের একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

এছাড়া মাছরাঙা টিভির সাধারণ সেকশনের একজন কর্মকর্তা, চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মী এবং বাংলাভিশনের একজন গাড়ি চালক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মহামারী করোনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন প্রশাসনের পাশাপাশি ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাংবাদিকরা । কিন্তু দুঃখের বিষয় সাংবাদিকদের খোঁজ-খবর কেউ রাখে না। এমন কি যাদের কলমের লেখায় আজ অনেকেই বড় বড় নেতা হয়েছেন তারাও এই কলম সৈনিকদের খোঁজ-খবর রাখে না।

“সুসময় অনেকেই বন্ধুবটে হয়, অসময় হায় হায় কেউ কারো নয়”।

সুসময় তো অনেককেই পাশে পাবেন। দুঃসময়, দুর্যোগে কজন পাশে থাকে। সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে করোনা। সেটা বোঝার সময় এখন। যখন অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা ঘরবন্দী হয়ে আছেন। করোনা ঝুঁকির কারণে তারা মানুষের পাশে থাকতে পারছেন না। সেই মুহূর্তে সাংবাদিকরা তাঁদের জীবনের ঝুঁকি জেনেও দিন-রাত কাজ করে চলেছেন, তুলে ধরছেন নানা অনিয়ম, দুর্নীতিসহ পুরো জাতির সুখ দুঃখ, করছেন সাবধানতা, দিয়ে যাচ্ছেন সতর্কবার্তা। কিন্তু একবার কি কেউ খোঁজ নিয়ে জেনেছে এই মানুষগুলো কেমন আছে, কিভাবে চলছে তাদের সংসার।

নিম্ম-বিত্তদের ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন জন প্রতিনিধি রাজনীতিবিদ ও সমাজের বিত্তশালীরা, সেখানেও নিরলস ভাবে কাজ করছেন সাংবাদিকরা, ঘরে খাবার নেই, বউ-বাচ্চা না খেয়ে থাকে, তবুও তারা আপনাদের জন্য, হাঁ আপনাদের জন্য, আপনাদের নেতা বানানোর জন্য, পেঠে পাথর চেপে আপনাদেরকে জাতির সামনে তুলে ধরে জনপ্রতিনিধি, নেতা, সমাজসেবক বানাচ্ছে সাংবাদিকরা। বহু নেতা আছেন যাদের আজকের অবস্থানের জন্য প্রথম দাবিদার সাংবাদিকরা। সেই আপনারাই আজ নেতা, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক হয়ে সাংবাদিকদের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন।

তাছাড়া ইতিমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন ভাষণে চিকিৎসক-নার্স পুলিশ সেনাবাহিনীসহ যারা এই দুর্যোগময় মুহূর্তে দেশ ও জনগণের সেবা করে যাচ্ছেন তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নানা সুবিধাদি ঘোষণা করেছেন। এই করোনার ঝুঁকিতে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেলে তাদের শহীদের মর্যাদা এবং ৫০ লাখ টাকা মৃত্যু সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য তেমন সুনির্দিষ্ট কোন দিক্-নির্দেশনা এখন পর্যন্ত পরিস্কার হয়নি। কেউ যে দায়িত্ব নিয়ে তা করবেন, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সত্যিকার অর্থেই কোনো অভিভাবক নেই গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য।

সরকার ছুটি বাড়িয়েছে, আরো হয়তো বাড়বে। সরকারের এই ছুটির সময়ে কোন কর্মী চাকরীচ্যুত হবেন না, তারা ঘরে অবস্থান করেই সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন। একমাত্র ব্যতিক্রম আমাদের এই গণমাধ্যম খাত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা গণমাধ্যমের প্রতিটি সেক্টরের কর্মীদের জন্য জীবনের নিরাপত্তা, পারিবারিক সুরক্ষা ও কর্মজীবনে নিরাপত্তায় নেই কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা। চাকুরী আছে,পদ আছে, পদবীও আছে, কিন্তু বেতন নেই। এমন একটি মহান,গুরুত্বপুর্ণ ও সম্মানজনক পেশা সাংবাদিকতা। কারণ একজন সাংবাদিকের সংগৃহীত সমাজের নানাবিধ উন্নয়ন, ইতিবাচক ও নেতিবাচক খবরাখবর মাধ্যমে একটি প্রিন্টিং গণমাধ্যম প্রকাশিত হয় বা একটি ইলেকট্রনিক্স গণমাধ্যম পরিচালিত হয়। দুঃখের বিষয় হলো সেইসব জেলা-উপজেলায় কর্মরত গণমাধ্যম কর্মী, যাদের পদ এবং পদবী আছে, নেই শুধু বেতন-ভাতা, তাদের জীবন কিভাবে চলে তার খবর কেউ রাখে না (হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যম জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের সম্মানী দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য)।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করে বলছি অসহায় সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ান। যারা মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে মানুষের পাশে আছেন, দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তারাই তো প্রকৃত মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেন, তাদেরও দাবি আছে আপনার কাছে, তারা লজ্জায় চাইতে পারে না, তাদের বাঁচিয়ে রাখলে জাতির (রাষ্ট্র) ৪র্থ স্তম্ভ বাঁচবে, ঠিকমত কাজ করবে রাষ্ট্রের বাকি তিনটি স্তম্ভ, গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।