অবিস্মরণীয় মুহূর্ত নূরে আলম সিদ্দিকী

প্রকাশিত: ১:৫৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২০

৩২ নম্বর থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আমরা চারজন, সিরাজুল আলম খান এবং খুব সম্ভবত তোফায়েল আহমেদ সাহেব একই গাড়িতে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই। আমরা মঞ্চে উঠে গেলাম (সিরাজ ভাই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যে মঞ্চে উঠেননি)। আমরা মাইকের দখল নিলাম। এই বিশাল জনসমূদ্রকে শ্লোগানে শ্লোগানে শুধু মুখরিত করিনি, মানুষকে উদ্বেলিত করেছি, উচ্ছসিত করেছি। মানুষের প্রত্যয় ও প্রতীতিকে শানিত করেছি শ্লোগান ও খণ্ড খণ্ড বক্তৃতার মধ্য দিয়ে। আমি বিনীতভাবে জানাতে চাই, বঙ্গবন্ধু যখন ধীর পদক্ষেপে মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে শুনিয়েই আমি রেসকোর্সের উদ্বেলিত জনতাকে বললাম, বঙ্গবন্ধু আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, তোমরা তো স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিজ্ঞায় উজ্জীবিত; প্রদ্বীপ্ত সূর্যরশ্মির মত ভাস্মর। তোমাদের শক্তি কোথায়? সামর্থ কতটুকু। আমরা বঙ্গবন্ধুকে বলেছি, আমাদের শক্তির উৎস এই উদ্বেলিত জনতা। একেই আমরা গণসমূদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বালাবো। একেই আমরা আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত করে ওদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে ছিন্ন ভিন্ন করে স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনবো। তাকে দুহাত তুলে দেখিয়ে বললাম, ওই যে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠছেন। তার নির্দেশে স্বাধীনতার জন্য বুকের শেষ রক্তবিন্দু প্রদান করতে আপনারা প্রস্তুত আছেন কী না। সারা রেসকোর্স ময়দানভরা জনতা দুহাত উত্তোলন করে বজ্রনির্ঘোষে গর্জে উঠলো ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধু ধীর পদক্ষেপে এসে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। তার ঐতিহাসিক ভাষণটি শুরু করলেন। ভাষাশৈলী, প্রকাশভঙ্গি, শব্দচয়ন, অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ- সব কিছু মিলে একটা অদ্ভুত রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে স্বাধীনতার পূর্ণ ঘোষণাই প্রদত্ত হয়েছিল ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটিতে। কিন্তু অতিসতর্কতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শব্দচয়নের যে কুশলী পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, তাতে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার কোন সুযোগ তিনি রাখেননি। আমি তার নিজের প্রদত্ত শতাধিক ভাষণ নিজ কানে শোনার সৌভাগ্যের অধিকারী। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তো বটেই, নির্দেশ-নির্দেশনাকে উপলব্ধি ও মননশীলতায় পরিণত করার জন্য এবং তার বাগ্মিতাকে জ্ঞানপিপাসু ঋষিবালকের মতো অনুশীলন করার জন্য আমি একান্তচিত্তে তার বক্তৃতা শুধু শ্রবণ করি নি, অনুধাবন করেছি, উপলব্ধি করেছি, আত্মস্থ করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টাও চালিয়েছি। সত্যতার খাতিরে এ বাধ্যবাধকতাকে স্বীকার করতেই হবে, তার নিজের প্রদত্ত কোন ভাষণের তুলনা ৭ই মার্চের ভাষণের সঙ্গে হতে পারে না। তিনি তেজস্বী বক্তা ছিলেন। বাগ্মী ছিলেন। এটা অস্বীকার করা না গেলেও ৭ই মার্চে শব্দচয়ন থেকে শুরু করে তার প্রয়োগ এতই কার্যকর ছিল, ওই সভায় উপস্থিত সবার মন ও মননশীলতাকে প্রচণ্ড আবেগে শুধু অভিভূতই করে নাই, স্বাধীনতার চেতনাকে প্রত্যয় ও প্রতীতিতে পরিণতই করে নাই, বরং নিজ আঙ্গিকে সবাই এ প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরেছে যে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে হলেও পরাধীনতার বক্ষবিদীর্ণ করে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে। আমি সমস্ত উপলব্ধি ও সত্তায় আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। আমার স্থির ধারণা, ৭ই মার্চে বাংলাদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য আল্লাহর রহমতে তিনি উজ্জীবিত ছিলেন। ওই ভাষণটি স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিপূর্ণ প্রত্যয় সৃষ্টির লক্ষ্যে সমস্ত জাতীয় চেতনাকে এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ ও অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছিল। ভাষণটি গোটা জাতিকে এমনভাবে উদ্বেলিত করেছিল যে, পৃথিবীর কোন একক বক্তৃতায় এরূপ দৃষ্টান্ত আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে না। অনেকেই আবেগ আপ্লুত হৃদয়ে, অভিভূত চিত্তে ৭ই মার্চের ভাষণটিকে গ্যাটিসবার্গে আব্রাহাম লিঙ্কনের বক্তৃতার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। আমি এই তুলনাটি করতে নারাজ। কারণ দুটি বক্তৃতার প্রেক্ষাপট এবং আঙ্গিক ছিল ভিন্নতর। গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত আমেরিকার গৌরবদ্বীপ্ত মঞ্চে দাড়িয়ে আব্রাহাম লিংকন ওই ভাষণটি দিয়েছিলেন। সামাজিক দুর্যোগের মেঘ সরে গিয়ে যখন আমেরিকার পূর্ব দিগন্তে হাস্যজ্জ্বল সূর্য উদ্ভাসিত, তখন আমেরিকার বিজয়ী নেতা সারা বিশ্বের জন্য জগৎখ্যাত ভাষণটি দেন (Govt. of the people, by the people, for the people, can&_t perishfrom the earth.) কিন্তু ৭ই মার্চের প্রেক্ষাপটটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলার দিগন্ত বিস্তৃত আকাশে ঘন কালো মেঘে ঢাকা। একদিকে নিদারুণ অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বুক ভরা প্রত্যাশা। স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস ও আকাঙ্খা তখন পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করার জন্য উদগ্রীব। বাংলার মানুষের এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই ৭ই মার্চের ভাষণটি প্রদত্ত। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে, হরতাল, অসহযোগ, অবরোধের মধ্য দিয়ে অহিংস ধারাকে অব্যহত রেখে চলছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। এর পূর্বে ৩রা মার্চ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় বঙ্গবন্ধু অহিংস ও সুশৃঙ্খলভাবে এবং নাশকতার সম্পর্কে সতর্ক থেকে আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। ৭ মার্চের ভাষণটিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কবিরা ভাষণটিকে মহাকাব্য বলেছেন। কেউ কেউ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে বর্ণনা করেছেন। চিত্রশিল্পীরা এটিকে পিকাসো’র আঁকা ছবির সাথে তুলনা করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা বলে উদ্ধৃত করেছেন। মনস্তাত্ত্বিকরা ভাষণটিকে দেখেছেন তাঁর দগ্ধীভূত হৃদয়ের বিস্ফোরিত দাবানল হিসেবে। আমরাও বলি- ৫২-এর বর্ণমালা আর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ, বিকাশ, ব্যাপ্তি ও সফলতার এটি কেবল পূর্ণ বহিঃপ্রকাশই নয়, ভাষণটি পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পরাজয়কেই কেবল নিশ্চিত করে নি, সমস্ত মানুষের মননশীলতা ও প্রতীতিকে প্রত্যয়ে উজ্জীবিত করে নি, একটা অদৃশ্য রাখীবন্ধনে সমগ্র জাতিকে শুধু আবদ্ধই করেনি, লড়াকু, অকুতোভয় একটি সত্তাকে কুশলী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শব্দচয়ন- তার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ লক্ষ মানুষের মননশীলতাকে এমনভাবে শানিত করেছে যে, সর্বশ্রেণি ও পেশার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সকলেই যা শুনতে এসেছিলেন, ঠিক তাই শ্রবণ করে স্বাধীনতার দৃপ্ত শপথে উজ্জীবিত হয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছেন। ৭ই মার্চের ভাষণের পূর্বে ৩২ নম্বরের বাসায় প্রচন্ড বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। এটা সর্বজ্ঞাত- একদল চেয়েছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যখন পেয়েছি তখন কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে ২৩ বছরের শোষণের হিসাব পাই পাই করে বুঝে নেব। তারপর আমরাই পশ্চিমাদের গলাধাক্কা দিয়ে বিদায় করে দেব। অন্য একটি অভিমত ছিল, রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু সরাসরি যেন জনগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষনা প্রদান করেন। আমরা যারা নির্বাচনের ম্যান্ডেটে বিশ্বাস করতাম- বন্দুকের নল নয়, জনগণের বুকনিঃসৃত নিশ্বাসকেই যারা সমস্ত শক্তির উৎস ভাবতাম। পেন্টাগন, ক্রেমলিন, দিল্লী অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীনদের দিকে তাকিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনায় তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অনুপ্রেরণার উৎস মনে করতাম না। আমাদের সুষ্পষ্ট অভিব্যক্তি ছিল- স্বাধীনতার ঘোষনা বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে অবশ্যই বজ্রনির্ঘোষে ঘোষিত হবে, কিন্তু বিচ্ছিনতাবাদের অভিযোগে বাংলার স্বাধীনতাকামী ও বিশ্বের জাগ্রত জনতাকে আদৌ যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, কিন্তু সকল চিন্তার অভিব্যক্তিতে ধৈর্যসহকারে সবার অভিমত শ্রবণ করার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট তাঁর ছিল। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি শুধু পাকিস্তানের পরাজয়কে সুনিশ্চিতই করে নি, বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ষ্টেটস্‌ম্যানশীপকে ভিন্ন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। ৭ই মার্চের ভাষণটি কৌশলগত দিক থেকে এতই নিখুঁত ও নিষ্কলুষ ছিল যে, আজও আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই- দিগন্তবিস্তৃত আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো তাঁর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হচ্ছে। ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার নির্দেশনাটি এতই সুষ্পষ্ট ছিল যে (আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি) ২৫শে মার্চ রাতে ওদের পৈশাচিক আক্রমণের পর আর নতুন করে কোন নির্দেশনার অপেক্ষা রাখে না।কী অদ্ভুত কৌশলী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তব্য ছিল সেটি। পাকিস্তানী জান্তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। একদিকে তিনি সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “ তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিচ্ছু বলবে না।” অন্যদিকে বলছেন- “আর যদি একটি গুলি চলে- যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” একদিকে তিনি ইয়াহিয়া খানকে ৪ টি শর্ত ছুড়ে দিলেন। অন্যদিকে তিনি নির্দেশনা দিলেন- “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পার্ত্তি।”“যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” এই উচ্চারণটি এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, প্রতিটি মানুষ নিষ্কলুষ চিত্তে উজ্জীবিত হল- শুধুমাত্র শত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করা নয়, শত্রুর যেকোন সশস্ত্র আক্রমণকে পরাভূত করতে হবে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ পাকিস্তানী পৈশাচিক জান্তা এই ভাষণটির মর্মার্থ উপলদ্ধি করতে পারেনি বলেই তারা ধরে নিয়েছিল, কোন একটি সময়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালালে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করলে- আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে, মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ৪ নেতাসহ আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় ২০/২৫ জন ব্যক্তিত্বকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা তালিকা প্রস্তুতও করেছিল। অনেক তর্কবিতর্কের পর ৭ই মার্চে ৩২ নম্বরের বাসায় সাব্যস্ত হলো- স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে উপস্থিত হওয়ার আগেই উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত করবে এবং আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত করবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুসরণ করার জন্য প্রতিটি মানুষকে ইস্পাতকঠিন প্রতীতির আওতায় নিয়ে আসবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই এক থেকে সোয়া ঘন্টা আগে এসেই আমরা মূল মাইকের নিয়ন্ত্রন গ্রহণ করি। খন্ড খন্ড অগ্নিঝরা বক্তৃতা ও শ্লোগানে রেসকোর্সকে প্রকম্পিত করে তুলি, তাদের চেতনাকে শানিত করে অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করি। মনি ভাই, রাজ্জাক ভাই, তোফায়েল সাহেব, জাতীয় ৪ নেতাসহ বেশকিছু নেতা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। ওই উজ্জীবিত জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণটি প্রতিটি মানুষের হৃদয়বন্দরে গ্রথিত রয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সেদিনের ভূমিকাটি কেন জানি না কেউই উল্লেখ করেন না। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে পা রেখেই উদ্বেলিত জনসমুদ্রকে দেখে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে, আজকের ছাত্রলীগ নেতৃত্ব এই অন্তর্নিহিত সত্যটি কল্পনার আবর্তে আনতে পারবেন না। ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত তাঁর প্রদত্ত সকল নির্দেশ ছাত্রলীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। শাসনতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় যে কথাগুলো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সরাসরি উচ্চারণ করা সম্ভব হতো না- তাঁরই নির্দেশে তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেই নির্দেশনাগুলো সংবাদপত্র, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে সারা বাংলার বাতাসে ছড়িয়ে দিতো এবং পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সেটি পালিত হতো। ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন- আমরা (স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ) সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থা ঘোষনার জন্য ডাকসু কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করি। স্থান সংকুলান না হওয়ায় সাংবাদিক সম্মেলনটি বটতলায় স্থানান্তরিত হয়। সেটিও যেন একটি জনসভায় পরিণত হয়। ৭ই মার্চের ভাষণের রেশ ধরে সাংবাদিকরা আমাদের প্রশ্ন করছিলেন। হঠাৎ করে সাংবাদিক মার্ক টালী প্রশ্ন করলেন (ইংরেজীতে) আপনাদের নেতা রেসকোর্স থেকে যে ৪টি শর্ত দিয়েছেন ইয়াহিয়া খান তা সম্পূর্ণ মেনে নিলে তো পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকে। তখন কি আপনারা স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারা পরিবর্তন করবেন, তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন স্তিমিত করে দেবেন, নাকি নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে চলমান আন্দোলনকে অব্যাহত রাখবেন? এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে অতি ক্ষিপ্রগতিতে আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন আমি উত্তরটি দিতে পেরেছিলাম যে, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো- তিনি বাংলার মানুষের নাড়ীর স্পন্দন, হৃদয়ের অনুরণন স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারেন এবং তারই আঙ্গিকে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন বলেই তিনি আমাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা- আমাদের চলমান স্বাধীনতা সংগ্রামের মুকুটহীন সম্রাট। সময় আসলে আপনিও বুঝতে পারবেন সংকট উত্তরণে তাঁর সিদ্ধান্ত কত নির্ভূল ও সুদূরপ্রসারী। আর সেই কারণেই নেতা আমাদের চেতনার মূর্ত প্রতীক। আরেকজন সাংবাদিক আরেকটি প্রশ্ন করেছিলেন- পাকিস্তানী সামরিক শক্তি সম্পর্কে আপনারা কতটুকু ওয়াকিবহাল? ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছেন যে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। তাহলে আপনাদের অস্ত্রভান্ডারটি কোথায়? আমরা জবাব দিয়েছিলাম- বাংলবাংলার প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয় একেকটি অস্ত্রাগার। আমরা সকলকে আন্দোলনের স্রোতধারায় বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে একটি মিলনের মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছি। প্রতিটি মানুষ আজ জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুত। নারী অথবা পুরুষ একটি মানুষও বেঁচে থাকলে স্বাধিকার আদায়ের এই অসহযোগ আন্দোলনকে মোকাবেলা করার শক্তি ওদের নেই। বিজয় নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সংশয় নেই। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের মধ্য সেই সত্যটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ৭ই মার্চ বাঙালির জাতীয় চেতনার সফলতা, সার্থকতা এবং তাদের চেতনাকে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করার অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। সুএ মানবজমিন